Showing posts with label মহাস্থানের ইতিহাস. Show all posts
Showing posts with label মহাস্থানের ইতিহাস. Show all posts

বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরাতন নগরী মহাস্থানগড়



বগুড়া শহর থেকে ১৩ কিলোমিটার উত্তরে করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে গেলে এই শহরের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের শহর মহাস্থানগড়। সেসময় এর নাম ছিল পুর্ণ্ড্রনগর।

বৌদ্ধ শিক্ষার জন্য প্রসিদ্ধ হওয়ায় চীন ও তিব্বত থেকে ভিক্ষুরা তখন মহাস্থানগড়ে আসতেন লেখাপড়া করতে। এরপর তারা বেরিয়ে পড়তেন দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। সেখানে গিয়ে তারা বৌদ্ধ ধর্মের শিক্ষার বিস্তার ঘটাতেন।

মহাস্থানগড়ের ইতিহাস সম্পর্কে জানা গেছে, এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত বাংলাদেশের সবচাইতে প্রাচীন রাজধানী শহর হচ্ছে মহাস্থানগড়। প্রাক মৌর্য যুগ, মানে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে থেকে এখানে মানব বসতির চিহ্ন পাওয়া যায়।
এছাড়া মহাস্থানগড়ে পাওয়া বিভিন্ন প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন হতে জানা যায় যে, কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত এ স্থান পরাক্রমশালী মৌর্য, গুপ্ত এবং পাল শাসকবর্গের প্রাদেশিক রাজধানী ও পরবর্তীকালে হিন্দু সামন্ত রাজাদের রাজধানী ছিল। এই দুর্গনগরীর বাইরে উত্তর, পশ্চিম, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমের সাত-আট কিলোমিটারের মধ্যে এখনও বিভিন্ন ধরণের প্রাচীন নিদর্শন রয়েছে যা উপ-শহরের সাক্ষ্য বহন করে।

জানা গেছে, মহাস্থানগড়ে প্রথম খনন কাজ শুরু করেন আলেকজান্ডার কানিংহাম নামের একজন প্রতœতত্ত্ববিদ। তিনি ভারতের প্রতœতত্ত্ব জরিপ অধিদপ্তরের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত খননকাজ চলছে। ইতিমধ্যে দুর্গনগরীর দুর্গ ছাড়াও কিছু কিছু ভবনের অস্তিত্ব আবিষ্কার করা হয়েছে।

শুরুটা কানিংহাম করলেও মহাস্থানগড়ে সবচেয়ে ভালভাবে খননকাজ শুরু হয় ১৯৯১ সালে। সেসময় ফ্রান্সের কয়েকজন প্রতœতাত্ত্বিক বাংলাদেশের প্রতœতাত্ত্বিকদের সঙ্গে মিলে যৌথভাবে কাজ শুরু করে।

তাদের গবেষণায় অনেক প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া গেছে। যেমন ভাস্কর্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন যুগের মুদ্রা, মাটির তৈজসপত্র, পুঁতি ইত্যাদি। এছাড়া পাওয়া গেছে প্রাক মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও মুসলিম যুগের কাঁচাপাকা ঘরবাড়ি, রাস্তা, নর্দমা, কূপ, মন্দির, মসজিদ, তোরণ, বুরুজ ইত্যাদি।

এসব ছাড়াও সেসময়কার নগরজীবনে ব্যবহৃত বিভিন্ন দ্রব্যাদি যেমন রৌপ্য ও তাম্র মুদ্রা, কালো মসৃণ মৃৎপাত্র, পোড়ামাটির ফলক, মূর্তিসহ মাটি ও ধাতব দ্রব্যাদি ইত্যাদি পাওয়া গেছে। এসবের অনেক কিছুই দেখতে পাওয়া যাবে মহাস্থানগড় জাদুঘরে গেলে।

মহাস্থানের ইতিহাস পর্ব -৪ দেশের সবচেয়ে প্রাচিন মহানগরী।



মহাস্থানের ইতিহাসঃ ঈসা (আঃ)- এর জন্মের পাঁচশ বছরেরও আগে এখনকার বগুড়া শহরের প্রায় ১২ কিলোমিটার উত্তরে গড়েউঠেছিল এ দেশের সবচেয়ে প্রাচিন মহানগরী। এক হাজারেরও বেশী সময় টিকে ছিল নগরীটি।

উচু প্রাচির ঘেরা এ নগরীর বাইরেপ্রায় ৮ কিলোমিটার এলাকরা জুরে ছিল এর শহরতলি এত বড় শহরতলি সহ নগরী সে যুগে পৃথিবীর অন্য কোথাও কমই ছিল।নগরীটির নাম ছিল পুন্ড্রনগর রাজধানী পুন্ড্রনগর থেকে সাশন করা হত পুন্ডবর্ধন রাজ্য পুন্ড্রনগরের এখনকার নাম মহাস্থানগড় এ মহাস্থানের মাটির নিচে চাপা পরে আছে পৃথিবীর প্রাচিনতম নগরী ।

পুন্ড্রনগর এটিদক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে প্রাচিন নগরী এর যেটুকু খুরে বের করা গেছে তাতে বৌদ্ধ, হিন্দু ও মুসলিম যুগের নির্মান সৌন্দর্যেরসন্ধান মিলেছে এ তিন নির্মান যুগেই এলাকাটা ছিল সমৃদ্ধ। সম্রাট অশোকের আমলে এটি ছিল বিখ্যাত জনপদ সম্ভবত এটি সেসময়ই হয়েছিল প্রাচিনকলে পুন্ডনগর ছিল অত্যন্ত নামকরা এলাকা মহাভারতের মতো প্রাচিন সাহিত্যে পুন্ড্রের উল্লেখ আছে এছাড়া বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মীয় প্রাচিন গ্যন্থেও পুন্ড্রবর্ধনের কথা বলা আছে।

এসব কারনে অনেক পন্ডিত সিন্ধু সভ্যতার মোহেন জোদারো-এর সাথে প্রাচিন পুন্ড্রবর্ধনের তুলনা করে বলেন, মহাস্থান হলো বাংলাদেশের মোহেন জোদারো চিনের বিখ্যাতপন্ডিত ও পরিব্রাজক হিউয়েন সাং ৬২৯ থেকে ৬৪৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে পুন্ড্রবর্ধনে এসেছিলেন। তার লেখায় তিনি পুন্ন-ফ- তনন বাপুন্ড্রবর্ধনের কথা খুবই গুরুত্বের সাথে বর্ণনা করেছেন তিনি বলেছিলেন এই নগরীর ৬ কিলোমিটারের মধ্যে ভাসুবিহার অবস্থি এটি সুপ্রাচিন কালের বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় এখানে বিদ্যা অর্জন করতে পৃথিবীর নানান দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা আসতেন।

তিনিউল্লেখ করেছেন,পোসিপো বা ভাসুবিহারে কমপক্ষে ৭০০ বৌদ্ধ ভিক্ষু ছিলেন ভাসুবিহারসহ ২০ টি জ্ঞানকেন্দ ছিল তখন পুন্ড্রনগরেরআশেপাশে। তার বর্ণনায় খুবই চাঞ্চল্যকর যে তথ্যটি পাওয়া যায় সেটি হল মহামতি গৌতম বুদ্ধ পুন্ড্রবর্ধন এলাকায় এসেছিলেন।এখানে তিনি ৩ মাস সময় অতিবাহিত করেছিলেন। এ সময় তিনি অহিংসার বাণীসহ বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার করেন।

হিউয়েন সাংপুন্ড্রনগেও মৌর্য সম্রাট অশোক নির্মিত গৌতম বুদ্ধের দেহ ধাতুর উপর প্রতিষ্ঠিত একটি স্মারকস্তম্ভ পরিদর্শন করেছিলেন। প্রাচিনকালে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে চীন ও মঙ্গোলিয়া থেকে ছাত্ররা আসতেন ভাসুবিহারে। এ থেকে বোঝা যায়, এ শিক্ষাকেন্দটি কতগুরত্বপূর্ণ ছিল। 

২ হাজার ৪০০ বছর আগে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ছাত্ররা যখন এ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসত তখন গ্রীস ছাড়া পুরোইউরোপই ডুবে ছিল অশিক্ষা ও বর্বতার অন্ধকারে। শুধু জ্ঞানচর্চাই নয়, যেকোন ধরনের লেখা-পড়া ছিল তখন ইউরোপিয়ানদেরনগালের বাইরে। বিশ্ববিদ্যালয়টি টিকে ছিল প্রা‌য় ১ হাজার ২০০ বছর। পুন্ডুনগরের প্রায় চার কিলোমিটার পশ্চিমে গোকুল গ্রামে একটি বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবসেস আছে।

 আনুমানিক ষষ্ঠ শতাব্দীতে এটিবিহার হিসাবে ব্যবহৃত হলেও শিবমন্দির হিসেবে ব্যবহার হয়েছে আবার অনেকের মতে, পুন্ড্রবর্ধনের পাহারার কাজে পর্যবেক্ষণমঞ্চ হিসেবেও ব্যবহার হয়েছে এটি এলাকার মানুষের কাছে এটি গোকুল ম্যাড় নামে পরিচিত।

 তবে এর নির্মান ও গঠনশৌলীঅনুযায়ী এটাকে বৌদ্ধ বিহার ধরা যায় পাহারপুর বৌদ্ধ বিহারের সাথে এর বেশ মিল রয়েছে ভূমি থেকে প্রায় ৫০ ফুট উচু ১৭২ টিভরাট করা কক্ষসহ অনেকটা কচ্ছপের পিটের মত এই ইমারতটিকে লখীন্দরের ম্যাঢ়াও বলা হয়। সপ্তম শতাব্দীর শুরু থেকেমুসলমানদের আগমনের আগ পর্যন্ত প্রায় ১২০০ শতাব্দী পর্যন্ত এই বিহার ব্রবহৃত হয়েছে। 

মাটি কুড়ে পুন্ড্রমহানগরীর যতটুকু রহস্যউদঘাটন করা হয়েছে তাতে বোঝা যায়, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ও আর্কিটেকচারে সে সময় বিরাট উন্নতি সাধন হয়েছিল প্রাচিরসহপাকা ইমারত, চমৎকার ইটের সিঁড়ি, বারান্দাযুক্ত বহুতল ভবন, বিশাল অট্টলিকা, পানীয় জলের কুয়া, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা-এসব ছিল চমৎকার। মাটির গভীরে পালযুগীয় ইমারতের নিচে আরো দুটো নির্মাণ যুগের সন্ধান পাওয়া গেছে।

এখানে খনন কাজচলানোর পর ৩০ ফুট নিচে আসল মাটির সন্ধান পাওয়া গেছে এই গভীরতার মধ্যে পর্যায়ক্রমে ১৭ কোথাও বা ১৮ টি বসতিস্তম্ভেরঅস্তিত্ব আছে। লোহা, তামা, সোনা, ব্রোঞ্জ বিভন্ন ধাতু, পাথর ও পোড়ামাটির বিভন্ন দ্রব্য ছড়িয়ে আছে এসব স্তরে।

 নগর পরিকল্পনাবিদর মনে করেন, নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে এই নগরীর তিন দিকে খাল কাটা হয়েছিল আর এক দিকে ছিলকরতোয়া নদী। ফলে শত্রুর আক্রমন অনেকটা নিরাপদে ছিল শহরটি। এর পর আরো উচু ঘিেও দুভেদ্য হয় এ প্রাচিন রাজধানীশহরটিকে। খুব উঁচু এই প্রাচির ১৭ ফুট পর্যন্ত চওড়া ছিল। সৈন্যদল প্রাচিরের উপর হেটে পাহারা দিতে পারত। এই প্রাচিরের উপরদাড়িয়ে বহু দূরের শত্রুদের দেখা যেত। দুর্গ প্রাচিরের বাইরে উত্তর দিকে গোবিন্দ ভিটায় খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক থেকে জন বসতি শুরুহয়েছিল। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম ও দ্বিতীয় শতকের চিত্রফলক, ছাচে ঢাল ও ছাপযুক্ত তামার মুদ্রা সহ নানা রকম নিদর্শন পাওয়া গেছেএখানে। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দী থেকে বিভন্ন অঞ্চলের মাটির পাত্র, মুদ্রা, অলংকার, পোড়ামাটি ও পাথরে খোদাই করা চিত্রকলা,পাথরের বুদ্ধমূর্তি, বিভন্ন দেবদেবীর মূর্তি, তামার পদক, লোহার বর্শা, তীর, ছুরি, চাকু, পেরেক প্রভূতি এখানে পাওয়া গেছে।

 সম্রাটআশোকের ব্রাহ্মী শিলালিপি ছাড়াও নগরী ও সংস্কৃতিসহ প্রাচিন বাংলালিপি এখানে পাওয়া গেছে। এখানে প্রাপ্ত দুটি ধাতব পাতপাকিস্থানের তক্ষশীলায় পাপ্ত অনুরূপ পাত্রের চেয়েও উন্নত। পরে মুসলিম সুলতানি আমলের ইমারত সহ অনেক নিদর্শন পাওয়াগেছে। ১৩৭৫ খ্রিস্টাব্দের ইলিয়াস শাহ এবং ১৪৮০ খ্রিস্টাব্দের সামসুদ্দিন ইউসুফ শাহের আমলের মুদ্রাও পাওয়া গেছে। এখানেমৌর্য, শুঙ্গ, সেন, পাল ও সুলতানি আমলের নিদর্শনই শুধু পাওয়া যায়নি, বরং এখানকার সাথে বহু ঐতিহাসিক ঘটনা জঢ়িত।গৌতম বুদ্েধর আগমন ও সম্রাট অশোকের কীর্তি চাড়াও প্রথম বঙ্গ বিজয়ী ইখতিয়ার আহমেদ মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজিরস্মৃতিও এখানে জড়িয়ে আছে। পুন্ড্রবধৃনের কাছেই করতোয়া নদীর উপর সেতু বানিয়ে কাম রূপ হয়ে তিব্বতে অভিযানচালিয়েছিলেন তিনি। ইসলাম প্রচারক সাধক বলখের যুবরাজ সুলতান ইব্রাহিম বলখি মাহীসাওয়াার এখানে এসে ইসলাম প্রচারকরেছিলেন। রাজর পশুরামের সেনাপতিসহ এ এলাকার মানুষ ব্যপকভাবে তার মাধ্যমে ইসলামে দিক্ষিত হন। ইতি ঘঠে অত্যাচারিপশুরামের রাজত্বে। বিখ্যাত ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামী ফকির মজনু শাহ কয়েক বছর ধেও মহাস্থানকে কেন্দ করেই পরিচালনা করছিলেন তার যাবতীয়কর্মকান্ড। এভাবেই প্রায় আড়াই হাজার বছর ধরে ইতিহাসের নানা ঘাত প্রতিঘাতের নিরব সক্ষী হয়ে দাড়িয়ে আছে মহাস্থানগড়।মহাস্থানের প্রতিটি ইট ও ধ্বংসাবসেসএসব ইতিহাসের নিদর্শন হয়ে আছে এ এলাকার পুরো খনন কাজ সম্পন্ন হলে বেরিয়ে আসবেইতিহাসের আরও জলন্ত নমুনা। এতে মানব জাতির আরও কল্যান হবে। ইতিহাস অনুসন্ধানীদের উচিত যত তাড়াতাাড়ি সম্ভবমহাস্থ্‌নগড় পরিদর্শন করা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একই এলাকায় এত দীর্ঘ সময়ের ইতিহাস আর কোথাও নেই।

এখানে আছে এঅঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ট তিন জাতি ও ধর্মের শাসন এবং ইতিহাসের অসাধারন নমুনা। ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ মহাস্থানগড়ঃ মহাস্থান শব্দটির অর্থ হচ্ছে পবিত্র স্থান। মহাস্থানগড় বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহের মধ্যেঅন্যতম। বর্তমানে মহাস্থানগড় শিবগঞ্জ থানার অন্তর্গত। এটি বগুড়া শহর থেকে ১৩ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। এটি মূলতপ্রাচিন বাংলার পুন্ড্রবর্ধন রাজ্যের রাজধানি পুন্ড্রনগর এর ধ্বংসাবশেস। এটি একটি সুরক্ষিত দুর্গেও আদলে তৈরী নিদর্শন। এটিরপূর্ব দিক দিয়ে করতোয়া নদী প্রবাহিত। দূর্গটির মধ্যে প্রচিন কালের মন্দির, টিলা, মসজিদ, বাসগৃহের নিদর্শনাবলী দেখতে পাওয়াযায়। দূর্গটি সুবিশাল এক প্রাচির দ্বারা বেষ্টিত। এই সুবিশাল ও সুপ্রাচিন প্রাচিরটি উত্তর-দক্ষিনে ১৫২৫ মিটার দীর্ঘ ও পূর্ব পশ্চিমে১৩৭০ মিটার প্রস্থ। এটি সমতল থেকে ৫ মিটার উচু। পুন্ড্রনগর ছিল সমগ্র বাংলার সর্বপ্রধান ও সর্বপ্রাচিন দূর্গ নগরী। এটিমৌর্যবংশীয়,গুপ্তবংশীয় ও পাল সাশকদের প্রাদেশিক রাজধানী ছিল। শেষদিকে হিন্দু সামস্ত রাজাদের রাজধানীও ছিল এটি। ১৯২৭সালে শুরু হওয়া খননকার্যে

অনেক নিদর্শন তথ্য স্থাপত্য আবিস্কৃত হয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ঃ জীয়তকুন্ড, মানকালিরধাপ, পশুরামের বাসগৃহ, বৈরাগির ভিটা, খোদার পাথর ভিটা ইত্যাদি। বর্তমান সময়ে মহাস্থানের উঁচু গড়ে সবচেয়ে বেশী নজর কাড়বে হযরত শাহ্‌ সুলতান বলখী (রহ:) এর মাজার প্রাঙ্গণ (সুদূর বল্লখদেশ থেকে এসেছিলেন নাম হয় বলখী)। জীয়তকুন্ড কূপটির ভিতরের পরিধি ৩.৮৬ মিটার ও বাইরের পরিধি ৪.৭৮ মিটার। কূপটি১৮শ ১৯শ শতকে নির্মিত। কূপটির ভিতরে গ্রানাইট পাথরের একটি প্রস্তরখন্ড আছে। এটি ছাড়াও কতকগুলো পাথর তাকে তকেসাজানো আছে। কূপটি বর্তমানে মৃত। এছাড়াও খননকার্যে যে সকল স্তুপ আবিষ্কৃত হয়েছে সেগুলোর ছোট্ট বিবরন নিচে তুলে ধরাহলঃ


1.   গোবিন্দ ভিটা ঃ সুরক্ষিত দূর্গের উত্তর-পশ্চিম কোনায় অবস্থিত মন্দির। করতোয়া মাহাত্ন্য নামক গ্রন্থে এটি বিষ্ণু মন্দির নামেপরিচিত ।
2.     খুরনার ধাপ ঃ সুরক্ষিত দূর্গের ১ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত মন্দির । 
3.     মঙ্গল কোট ঃ খুলনার ধাপ থেকে ৪০০ মিটার দক্ষিনে অবস্থিত মন্দির। 
4.     গোসাইবাড়ি ধাপ ঃ এটিও একটি মন্দির। এটি খুলনা ধাপ থেকে  কিলোমিটার দক্ষিনে অবস্থিত। 
5.     বিহার (তোতারাম পন্ডিতের ধাপ) ঃ সুরক্ষিত দূর্গের ৪ কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে মঠ। 
6.   ভাসু বিহার (নর পতির ধাপ ) ঃ বিহারের ১ কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে কয়েকটি মঠের (এই বিহারকে চিনা পর্যটক হিউয়েনসাং পো
     সিপো বিহার বলে আখ্যায়িত করেন) 
7.     গোকুল মেধ ঃ এটি লখিন্দরের বাসর ঘর নামে অধিক পরিচিত। এটি দূর্গ থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দক্ষিনে অবস্থিত। 
8.     কান্দের ধাপ ঃ গোকুল মেধের দক্ষিন-পূর্বে অবস্থিত মন্দির। এটি কার্তিকের মন্দির নামে পরিচিত। যে কেউ মহাস্থানে এলেযেটি দেখা সবচেয়ে প্রয়োজনীয় করেন সেটি হচ্ছে প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর। এটি স্থাপিত হয় ১৯৬৭ সালে।
মহাস্থানের  সবচেয়ে  প্রাচিননিদর্শন  ব্রাহ্মী/শিলাপি যেটিতে লেখা পাওয়া যায় । এছাড়াও মহাস্থানগড় জাদুঘরে যে সব নিদর্শন পাওয়া যায় সেগুলোর বিবরননিচে দেওয়া হল
 ৪র্থ ও ৫ম শতকের দন্ডায়মান বুদ্ধের মূর্তি ও বেলেপাথরের অলংকৃত স্তম্ভ । শৃঙ্খ যুগের পোড়ামাটির ফলক,ঢালাই মুদ্রা, মৃৎপাত্র, পোড়ামাটির সীল রয়েছে
 যা খ্রীস্টপূর্ব ৪০০-২০০ শতকের। ৬ষ্ঠ-৭ম শতকের সূর্য, নারী মূর্তি, ব্রোঞ্জমূর্তি, বেলেপাথরের বুদ্ধ।  ৯ম-১০ম শতকের জালের গুটিকা, সূর্যের মূর্তি, শিবলিঙ্গ, ব্রোঞ্জের মূর্তি, বিষ্ণু, বরাহ  
বিষ্ণু, গরুড়ারোহ বিষ্ণু, চামুন্ডা,গণেশ, পার্বতি, মূর্তি, অবলোকিতেশ্বও, চামধারিণী, কৌমারি, নরসিংহি মহিষমর্দ্দিনী শোভা পাচ্ছে। 
১১শ- ১২শ শতকের প্রস্তর নোড়া, মর্বেল পাথরের নন্দী, বিদ্যাধর, মনসা, ব্রহ্মা, হরিহর, হরগৌড়ে, মা ও শিশু, মন্দির, নৃত্যরতগনেশ, গৌরি, বিষ্ণু, রেণুগোপাল, বিষ্ণুপট্টি, নবগ্রহ প্যানেল,
ননীগোপাল সহ অন্যান্য মূর্তি। ১৮শতকের নন্দীবৃষ, শিবলিঙ্গ ইত্যাদি।পোড়ামাটির দুর্গা, পদ্ম, চূরা, ফলকচিত্র। ১৫০৪ খ্রিস্টাব্দের আরবি শিলা লিপি। ১৬৮৫ সালের মহাস্থানের মাজার  
শরীফের সনদউল্লেখযোগ্য। মহাস্থানের আরো নিদর্শন অনাবিষ্কৃত রয়েছে। যা বিভন্ন সময়ে খননের ফলে উন্নোচত হচ্ছে মহাস্থানের নতুন নতুনপরিচয়। মহাস্থানগড় আমাদের ঐতিহ্য,
 আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের হেরিটেজ। মহাস্থান আমাদের প্রাচিনতম সভ্যতার নিদর্শনবহনকারী ইতিহাস। মহাস্থানগড় আজ ওয়ার্ড হেরিটেজ-এর অন্তর্ভূক্ত। যা আমাদের গৌরব।



মহাস্থানের ইতিহাস পর্ব -৩ পুন্ড্রবর্ধন: মাটির নিচে ঘুমন্ত ইতিহাস

উত্তর বঙ্গের প্রবেশপথ নামে খ্যাত বগুড়া জেলা সদর থেকে আরো ১২ কিলোমিটার উত্তরে যেতে হবে। বিশ্বরোড নামে পরিচিত বগুড়া-রংপুর মহাসড়ক ধরে যে কোনো যানবাহন ব্যবহার করে নেমে পড়া যাবে বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন নগরীতে। সাধারণ চোখে চট্ করে হয়তো এর গুরুত্ব বোঝা একটু কঠিন। কিন্তু যারা ইতিহাস-ঐতিহ্যের খোঁজ-খবর রাখেন তারা এখানে পা রাখতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করেন।



এখন থেকে আড়াই হাজার বছর আগেও এখানে গড়ে উঠেছিল এক সমৃদ্ধ নগর যার নাম পুন্ড্রনগর বা পুন্ড্রবর্ধন নগর কালের আবর্তনে এর বর্তমান নাম দাঁড়িয়েছে মহাস্থানগড়।

বিভিন্ন কারণে মহাস্থানগড় প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন প্রত্নস্থল বলে সারা পৃথিবীর পর্যটক এবং প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে মহাস্থানগড় আকর্ষনীয়। মহাস্থানগড় কথাটার শেষ শব্দ ‘গড়’-এর মানে হলো ‘উচ্চস্থান’ স্বাভাবিক ভূমির চেয়ে এ জায়গাটা অনেক উঁচু। তাছাড়া ঘটনাবহুল ইতিহাস, ধর্মীয় অনুভূতি, প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব সব মিলিয়ে মহাস্থানগড়ের মানসিক ধারণাও অনেক উঁচুতে অসংখ্য প্রাচীন রাজা ও ধর্ম প্রচারকদের বসবাসের কারণে এই উচ্চভূমিটি ‘মহাস্থান’ বা গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

লুকিয়ে থাকা নগর

মহাস্থানগড়েই এক সময় গড়ে উঠেছিল পুন্ড্রবর্ধন বা পুন্ড্রবর্ধন নগর নামের এক প্রাচীন বসতি যিশু খ্রিষ্টের জন্মেরও আগে এখানে সভ্য জনপদ গড়ে উঠেছিল প্রত্নতাত্ত্বিক ভাবেই তার প্রমাণ মিলেছে জানা যায়, খ্রিষ্টপূর্ব ৩য় শতাব্দী থেকে খ্রিষ্টীয় ১৫ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে এই নগর এক সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে বিস্তার লাভ করে বেশ কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত এখানে অসংখ্য হিন্দু রাজা ও অন্যান্য ধর্মের রাজারা রাজত্ব করেন। এর ভেতর রয়েছেন মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সামন্ত রাজবংশের লোকেরা। এরপর এখানে ধর্মীয় সংস্কার করতে আসেন ইসলাম ধর্ম প্রচারকরা অসংখ্য প্রত্নতাত্ত্বিক আর ইতিহাসবিদ মহাস্থানগড়কে হারিয়ে যাওয়া কিংবদন্তির নগরী পুন্ড্রবর্ধন বলে উল্লেখ করেছেন ।

বিখ্যাত চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ ৬৩৯ তেকে ৬৪৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে পুন্ড্রনগরে এসেছিলেন ভ্রমণের ধারাবিবরণীতে তিনি তখনকার প্রকৃতি ও জীবনযাত্রার উল্লেখ করে বর্ণনা করেন। দশম শতকের মধ্যবর্তী সময়ে এখানে রাজত্ব করেন রাজা নরসিংহ বা পরশুরাম কিংবদন্তি অনুযায়ী রাজা পরশুরাম ছিলেন অত্যাচারী তাকে উচ্ছেদ করে ইসলাম ধর্মের শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে আসেন হযরত শাহ্ সুলতান বলখী (রঃ) মাহী সওয়ার ধর্ম প্রচারক শাহ্ সুলতান বলখী (রঃ) সম্পর্কে রয়েছে আশ্চর্য কিংবদন্তি শোনা যায়, তিনি মহাস্থানগড় অর্থাৎ প্রাচীন পুন্ড্রনগরে প্রবেশ করার সময় করতোয়া নদী পার হয়েছিলেন একটা বিশাল আকৃতির মাছের পিঠে চড়ে এ জন্য তার নামের শেষে উল্লেখ করা হয় মাহী সওয়ার বা ‘ মাছের পিঠে আরোহনকরী’ বাস্তববাদীরা বলেন, মাহী সওয়ার নদী পার হয়েছিলেন ঠিকই তবে তা মাছের পিঠে চড়ে নয় বরং মাছের আকৃতিতে তৈরি করা নৌকার পিঠে চড়ে। উদাহরণস্বরূপ তারা বলেন, যে রকম ময়ূরের মুখ সদৃশ্য নৌকাকে ময়ূরপঙ্খি নৌকা বলা হয় এ রকম একটি ঘটনাই হয়তো শেষ পর্যন্ত এই মিথের সৃষ্টি করেছে।


দুচোখ মেলে দেখি

বর্তমান পুন্ড্রবর্ধন নগরে এখন ইলেট্রিক লাইট জ্বলে। নানা রকম দোকানপাট আর আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে এখানে এখানেই নিয়মিত বসে বৃহত্তম হাট ও বাজার। কৃষিজ ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে এখানে প্রচুর কর্মচাঞ্চল্য। এই এলাকার পাশ দিয়েই বয়ে গেছে প্রাচীন প্রমত্তা করতোয়া নদীর রূগ্ন কঙ্কাল আর উত্তর বঙ্গের ব্যস্ততম মহাসড়ক পুরো মহাস্থানগড় জুড়েই যেন এক বিচিত্র পরিবেশ প্রাচীনত্ব আর আধুনিকতার এমন সন্মেলন খুব বেশি জায়গায় চোখে পড়বে না।


এখনো মহাস্থানগড়ের এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে প্রাচীন আমলের অসংখ্য ভবনের ভগ্নাংশ এখানকার স্থানীয় অধিবাসীরা কাদামাটির সঙ্গে প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই পোড়ামাটির ইটগুলো দিয়ে তাদের বাসগৃহ তৈরি করেন তারা যে কতো অমূল্য সম্পদকে নষ্ট করে ফেলছে তা নিজেরাই জানেন না এখানে প্রায়ই খনন কাজের সময় মাটির নিচ থেকে উঠে আসে ইটের টুকরা বা পোড়ামাটির আসবাবের ভগ্নাংশ কখনো কখনো পাওয়া যায় ছোটখাট মূর্তি বা মুদ্রা বগুড়া-রংপুর মহাসড়ক ধরে উত্তরে যাওয়ার সময় বাসের জানালা দিয়ে তাকালেই চোখে পড়বে অস্বাভাবিক উচ্চভূমি আরেকটু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালে গাছ-পালার সবুজ পেরিয়ে চোখে পড়বে দূর্গনগরীর প্রাচীর দীর্ঘাকৃতির এই প্রাচীরই বলে দেয় সমৃদ্ধ সেই নগরবাসীরা নিরাপত্তাকে কতটা গুরুত্ব দিতো। লাখ লাখ পোড়ামাটির ইট আর সুড়কি দিয়ে ১ বর্গমাইল এলাকাকে ঘিরে ফেলা হয়েছে, নিজের চোখে না দেখলে এ বর্ণনা বিশ্বাস করা কঠিন দেয়ালের মতো যে বিশাল কাঠামো মহাস্থানগড়কে ঘিরে রেখেছে তার দৈর্ঘ ৫০০০ ফুট আর প্রস্থ ৪৫০০ ফুট। সমতল ভূমি থেকে এ দেয়ালের উচ্চতা ১৫ থেকে ৪৫ ফুট। প্রাচীরটি যথেষ্ট চওড়া ৫ থেকে ১০ ফুট প্রশস্ত এই প্রাচীরের উপরিভাগ দেখলে চীনের গ্রেটওয়ালের কথা মনে পড়বে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের তত্ত্বাবধানে এখানে কয়েকদফা খনন ও সংস্কার কাজ করা হয়েছে। পর্যটকরা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে পারবেন এই প্রাচীরের উপর হেঁটে ভ্রমণপিপাসুরা এখানে নির্বিবাদে ঘুরে বেড়াতে পারবেন। প্রাচীর ঘেরা এ অংশের ভেতরে অনেক চিহ্নিত স্থাপনা রয়েছে বিভিন্ন রাজবংশের আমলে নির্মিত এসব পুরোনো ভবনের ধ্বংসাবশেষের বেশির ভাগই রয়েছে মাটির নিচে।

বিভিন্ন সময়ে প্রত্নতাত্ত্বিকরা এসব খুঁড়ে তাদের পর্যবেক্ষণ সমাপ্ত করে আবার সংরক্ষণের তাগিদেই মাটি দিয়ে ঢেকে রেখেছেন। শুধু রসকষহীন ইটের টুকরো নয়, পুন্ড্রবর্ধনের ঐতিহ্যের খবর রাখলে পর্যটকরা এখানে এসে আরো বেশি রোমাঞ্চ বোধ করবেন।

 বর্তমান মহাস্থানগড়ের অন্যতম আকর্ষণ হলো হযরত শাহ্ সুলতান বলখী (রঃ) মাহী সওয়ারের মাজারটি। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ মাজারটি জিয়ারত ও পরিদর্শন করতে আসেন। শুধু ইসলাম ধর্মাবলম্বীরাই নয়, অন্যান্য ধর্মের অনুসারীরাও এখানে আসেন প্রার্থনা করতে।

মহাস্থানগড় দূর্গপ্রাচীরের দক্ষিণ-পূর্ব কোণায় এই মাজারটি অবস্থিত। সমতলভূমি থেকে টিলার উপর ওঠার জন্য রয়েছে অসংখ্য ধাপবিশিষ্ট সিঁড়ি মাজার চত্বরে রয়েছে একটি প্রাচীন কুয়া ও অনেকগুলো বেদি এছাড়া অতিথিদের জন্য রান্নার জায়গা ও বিশ্রামের ছাউনিও রয়েছে এখানকার একটি মাত্র যে প্রাচীন মসজিদ পাওয়া গেছে তা সুলতান ফারুক শাহের রাজত্বকালে, ১৭১৯ খ্রিষ্টাব্দে নিমার্ণ করা ব্রিটিশ শাসনামলে এই মাজারটি থেকেই ফকির বিদ্রোহের কর্মসূচি পরিচালিত হতো প্রতি বছর বৈশাখ মাসের শেষ বৃহস্পতিবার মাজারটি ঘিরে বিশাল এক মেলার আয়োজন হয়।

আরো দেখবেন যা

মহাস্থানগড় দূর্গপ্রাচীরের উত্তর পাশে রয়েছে এখানে পিকনিক করতে আসা দলের নির্ধরিত জায়গা এখান থেকে আরেকটু উত্তরে রয়েছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের স্থাপনকৃত জাদুঘর। জাদুঘরে মহাস্থানগড় ও আশেপাশের অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা অসংখ্য প্রত্নবস্তুর নমুনা রয়েছে মৌর্য, গুপ্ত,পাল ও অন্যান্য রাজবংশের অসংখ্য স্মৃতিচিহ্ন এখানে যত্নের সাথে সংরক্ষিত আছে রয়েছে কালো পাথরে খোদাইকৃত দেব-দেবীর মূর্তি, ধ্যানমগ্ন বুদ্ধমূর্তি, নকশা করা ইট-পাথরের টুকরো ও মুল্যবান পাথরের অলংকার আরো রয়েছে বিভিন্ন ধাতুর তৈরি অস্ত্র ও পাত্র, মুদ্রা ও স্মারক মহাস্থানগড়ের পূর্ণাঙ্গ মানচিত্রের দেখাও এখানেই মিলবে। জাদুঘরের প্রদর্শন কক্ষের বাইরে রয়েছে সুদৃশ্য বাগান নানা রঙের ফুল ও ফল গাছের সমারোহ সেখানে। বাইরের চত্বরেও রাখা হয়েছে বেশ কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নমুনা। জাদুঘরের সীমানার পূর্ব পাশে রয়েছে গোবিন্দ ভিটা নামে পরিচিত একটি প্রাচীন স্থাপনা ধারণা করা হয়, এখানে একটি বিষ্ণু মন্দির ও প্রমোদ ভবন ছিল গোবিন্দ ভিটার পাশ দিয়েই বয়ে গেছে করতোয়া নদী।

শোনা যায়, এই করতোয়া নদী এক সময় সুদূর ময়মনসিংহ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল কালের আবর্তনে এখন শুধু থেকে গেছে শীর্ণ একটি জলধারা শুধু বর্ষাকালেই এতে দুকূল উপচানো জলের ধারা দেখা যায়।

গোবিন্দ ভিটার দক্ষিণে রয়েছে প্রতœতত্ত্ব অধিদফতরের নিজস্ব রেস্টহাউজ পূর্ব অনুমতি সাপেক্ষে এখানে থাকাও যাবে মহাস্থানগড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য প্রাচীন কীর্তি। সব কিছু দেখে ফেলতে হলে হাতে সময় নিয়ে আসতে হবে।

 যেহেতু এখানে বৌদ্ধ, হিন্দুসহ আরো ধর্মের রাজত্বকাল অতিবাহিত হয়েছে তাই সব ধর্ম ও সমাজের আদি সংস্কৃতির নমুনাই এখানে একসঙ্গে পাওয়া যাবে।

এখানে আরো রয়েছে মৌর্য শাসনামলের নান্দাইল দীঘি, গুপ্ত আমলের ওঝা ধনন্তরীর বাড়ি, চাঁদ সওদাগরের বাড়ি, বেহুলা-লখিন্দরের বাসরঘর, নরপতির ধাপ সহ অসংখ্য প্রত্নস্থল বরেন্দ্রভূমির অংশ বগুড়া জেলাজুড়েই রয়েছে বেড়ানোর মতো অনেক জায়গা।

 আধুনিকতা আর ঐতিহ্যের সমন্বয়ে অনেক চিত্তাকর্ষক স্থানের সন্ধান পাবেন এখানে একটু সময় করে চলে আসুন সেই জনপদে, যেখানে সুদূর অতীতে আমাদের পূর্বপুরুষরা গড়ে তুলেছিলেন সমৃদ্ধ একটি গৌরবময় সভ্যতা।


যাতায়াত
ঢাকা থেকে খুব সহজেই সড়ক পথে বগুড়া যাওয়া যায় রাজধানীর কল্যাণপুর, গাবতলী ও মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রতি ৩০ মিনিট পর পর বাস ছাড়ে।

এস.আর, শ্যামলী, টি.আর, হানিফ, বাবলু, শাহ্ সুলতান সহ আরো অনেক পরিবহন সংস্থার বাস চলাচল করে এই রুটে সময় লাগে ৪ থেকে ৬ ঘন্টা এবং ভাড়া পড়বে ৩৮০ থেকে

৬০০ টাকা কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ট্রেনেও বগুড়া আসা যায় রংপুর এ´প্রেস ও লালমানিরহাট এক্সপ্রেস নামের দুটো ট্রেন পাবেন এখান থেকে বগুড়া শহরের হাড্ডিপট্টি বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে এবং দত্তবাড়ি থেকে টেম্পু অথবা সিএনজি অটোরিক্সায় চড়ে আধা ঘন্টার মধ্যেই পা রাখা যাবে মহাস্থানগড়ে।

থাকা-খাওয়া মহাস্থানগড়ে রাতযাপনের মতো ভাল কোনো হোটেল নেই তাই থাকার জন্য বেছে নিতে পারেন বগুড়া শহরের হোটেলগুলি সব ধরণের ও মানের থাকা-খাওয়ার জায়গা পাবেন এখানে ২০০ টাকা থেকে ১০০০ টাকায় রাতযাপনের ভাল ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

বেছে নিতে পারেন থ্রি স্টার হোটেল নাজ গার্ডেন, হোটেল সেফওয়ে, আকবরিয়া, সিয়াস্তা কিংবা পর্যটন মোটেল।

খাবারের ব্যবস্থা আছে সবগুলিতেই তবে বগুড়া এলে এখানকার প্রসিদ্ধ দই, ক্ষিরসা ও মহাস্থানগড়ের ‘কট্কটি’ নিতে ভুলবেন না।

 সোহেল রানা বগুড়া



মহাস্থানের ইতিহাস পর্ব - ২ গোবিন্দ ভিটা

গোবিন্দ ভিটা একটি খননকৃত প্রশ্চস্থল যা বগুড়া জেলাস্থ মহাস্থানগড়-পুন্ডণ্টনগরীর উত্তর পরিখার উত্তর তীরে অবস্থিত। গোবিন্দ ভিটা শষ্ফের অর্থ হিন্দু দেবতা গোবিন্দ তথা ব্পিুর আবাস। কিন্ম ব্পৈব ধর্মের কোন নিদর্শন এ স্থানে পাওয়া যায়নি। তবুও প্রশ্চস্থলটি স্থানীয়ভাবে গোবিন্দ ভিটা নামে পরিচিত। এ প্রশ্চস্থলের পূর্ব ও উত্তর পাশর্ব দিযে় করতোয়া নদী প্রবাহিত। গোবিন্দ ভিটা প্রশ্চস্থলটি ১৯২৮-২৯ সালে কে.এন দীক্ষিত খনন করেছিলেন। ১৯৬০ সালে ড. নাজিমউদ্দীন আহমদ এখানে একটি গভীর খাদ খনন করেন। দীক্ষিতের খননে পূর্ব ও পশ্চিমে পাশাপাশি অবস্থিত দুসেট মন্দির এবং পরপর চারটি যুগের নিদর্শনসমূহ পাওয়া গিযে়ছে।


(১) পশ্চিম পাশে রযে়ছে পরবর্তী গুপ্তযুগে (৬ষ্ঠ-৭ম শতাষ্ফী) নির্মিত বারান্দাযুক্ত একটি মন্দির যার ভিত্তিভৃমি অত্যন্ত গভীর এবং অফসেট যুক্ত।

(২) পশ্চিম পাশেই প্রাথমিক পাল যুগে (৮ম-৯ম শতাষ্ফী) প্রতিষ্ঠিত একটি বারান্দাযুক্ত মন্দির রযে়ছে যার ভিত্তি স্তরে স্মরে উঁচু করে নির্মিত হযে়ছিল।

(৩) পশ্চিম পাশের এ উঁচু ভিত্তিটি পরবর্তী পাল ও সেন যুগে এবং এমন কি মুসলমানদের সমযে়ও ব্যবহৃত হযে়ছিল মন্দিরের পাশে একটি চণ্ডীদেবীর প্রস্তর প্রতিমা (১১ শতাষ্ফী) এবং একটি নৃত্যরত গণেশের প্রস্তর প্রতিমা (১১ শতাষ্ফী) পাওয়া গিযে়ছে।
 (৪) পশ্চিম পাশের মন্দিরের উপরে মুসলিম তথা সুলতানি যুগে (১৫শ-১৬শ শতক) নির্মিত একটি ইটের প্লাটফর্ম আবিষকৃত হযে়ছে।



 গোবিন্দ ভিটা, মহাস্থানগড়, ব্‌ধমৎধাব;ড়া গোবিন্দ ভিটার পূর্ব পাশের মন্দির অংশে সুস্পষ্ট চারটি যুগের সাংস্কৃতিক নিদর্শনসমূহ আবিষকৃত হযে়ছে।

(১) পরবর্তী গুপ্ত যুগে নির্মিত বর্গাকৃতির মন্দির যার মধ্যে প্রদক্ষিণপথ বেষ্টিত একটি আয়তাকার ডায়াস রযে়ছে।

(২) প্রাথমিক পাল যুগে নির্মিত একটি কমপ্লেক্স এবং বহৃপাশর্ব বিশিষ্ট প্রস্তর বেদি।

(৩) পরবর্তী পাল যুগে নির্মিত কিছু ক্ষযি়্পু দেওয়াল এবং একটি সম্ভাব্য অদ্নিশিলা। মুসলিম তথা সুলতানি যুগে নির্মিত একটি ভদ্ন মেঝের মধ্যে ১৮টি মুদ্রা ভর্তি একটি মাটির পাত্র। মুদ্রাগুলি বাংলার সুলতানগণ জারি করেছিলেন।উল্লেখ্য, প্রাথমিক পাল যুগেই দুটি মন্দির ঘিরে একটি সাধারণ বেষ্টনী প্রাচীর নির্মাণ করা হযে়ছিল।

 (৪)এছাড়া মন্দির সংলদ্ন নদীর তীরে এ যুগে নির্মিত পাথরের রক্ষা বাঁধ বা রক্ষা প্রাচীর এবং একটি পাথরের বাঁধানো ঘাট ছিল যা ১৯২২ সালের প্লাবনে ভেসে গিযে়ছে।গোবিন্দ ভিটায় ১৯৬০ সালের গভীর খাদ খননের ফলে আবিষকৃত হয় মৌর্যযুগের ছাপাংকিত ও ঢালাই করা রৌপ্য মুদ্রা এবং উত্তরাম্ফলীয় কালো চক্‌ধসঢ়;চকে মৃৎপাত্র, অর্ধ-ডজন শূঙ্গযুগের (খ্রি.পূ. ২য়-১ম অষ্ফ) পোড়ামাটির ফলক



 একটি খোদাইকৃত নীল পাথরের চাকতি আকৃতির প্রসাধনী টেড্ড (খ্রি. ১ম-২য় শতাষ্ফী), একটি কাদা মাটির তৈরি সীলমোহর ও পোড়ামাটির মস্তক (৪র্থ শতাষ্ফী), তিনটি বৃহৎ মাটির পাত্র বা ভাট (খ্রিষ্টীয় ৬ষ্ঠ-৭ম শতাষ্ফী) যাতে শঙ্খখোসা ও চুন এবং নরকংকাল ছিল।







 এখানে প্রাপ্ত অন্যান্য নিদর্শনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বিভিন্ন আকৃতির ও ধরনের পোড়ামাটির দ্রব্য, স্বল্পমূল্যের পাথরের তৈরী গুটিকা ও বোতাম, কানবালা ও কুন্তল, নাকফুল ইত্যাদি। এছাড়া, পোড়ামাটির মূর্তি ও খেলনা এবং তামা ও ব্রোঞ্জের তৈরী বলয় এবং সুরমা দণ্ডও পাওয়া গিযে়ছে।




 সোহেল রানা বগুড়া

মহাস্থানের ইতিহাস

মহাস্থানগড় বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রাচীন পুরাকীর্তি পূর্বে এর নাম ছিল পুণ্ড্রবর্ধন বা পুণ্ড্রনগর এক সময় মহাস্থানগড় বাংলার রাজধানী ছিল।

এখানে মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন সাম্রাজ্যের প্রচুর নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে।

এর অবস্থান বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলায় বগুড়া শহর থেকে প্রায় ১০ কি.মি উত্তরে মহাস্থান গড় অবস্থিত।